আমাদের গণমাধ্যম কখনও নিরাপদ!?

ফিরোজ আলম মিলন :
বলতে গেলে গণমাধ্যম কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। ১৯৭১ সাল থেকে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ভূখণ্ডে গণমাধ্যম বারবার কারও না কারও রোষানলে পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে-আজকের গণমাধ্যম কি সত্যিই সংবিধানের চতুর্থ স্তম্ভ, নাকি সমাজের দর্পণ হিসেবে তার ভূমিকা ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে
বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার পক্ষে গেলে তোষামোদ, আর বিপক্ষে গেলে আক্রমণ ও নির্যাতন-এই দুইয়ের মাঝেই আটকে আছে আমাদের গণমাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক গণমাধ্যমকর্মীও যেন ‘রাতকানা’ হয়ে পড়েছেন। এরই পরিণতিতে গণমাধ্যমকে আজ ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ২৫ মার্চ গভীর রাতে দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যালয় ও ছাপাখানা পুড়িয়ে দেওয়ার ইতিহাস আজ অনেকেই ভুলতে বসেছেন। আমরা খুব সহজেই ইতিহাসকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলি বলেই হয়তো আজকের এই করুণ বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছি। কখনো কখনো বিদেশি শক্তিকে তুষ্ট করার তাগিদে আমরা এমন এক অবস্থানে পৌঁছে যাই, যেখানে গণমাধ্যমের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। সময়ের ব্যবধানে যিনি ক্ষমতায় বসেন, তার দালালি করাটাই যেন আমাদের নীতি-নৈতিকতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ক্ষমতার পালাবদলে গণমাধ্যম বারবার আক্রোশের শিকার হয়।
প্রকৃত অর্থে গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবে কাজ করাই তার দায়িত্ব নয়। সমাজে নানা মত, পথ ও আদর্শের মানুষের সহাবস্থান রয়েছে। অথচ সময় যত গড়িয়েছে, গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণের খড়্গ ততই ধারালো হয়েছে।
স্বাধীনতার পর একপর্যায়ে বহু গণমাধ্যম বন্ধ ঘোষণা করে হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা চালু রাখা হয়েছিল। এটি যেমন গণমাধ্যম ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়, তেমনি পরবর্তী শাসকরাও নানান কৌশলে গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছেন।
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরকেন্দ্রিক আন্দোলনের পর একাধিক গণমাধ্যমে অগ্নিসংযোগ ও সম্প্রচার বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শত শত সাংবাদিক ও কর্মচারী দীর্ঘদিন মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়ে। এতে শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্রও-কারণ এসব যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে আমদানি করতে হয়েছে।
ক্ষমতার রদবদলের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমকে নানা তকমা দিয়ে শত্রুতে পরিণত করার প্রবণতা আজও বিদ্যমান। সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার বহু নজির রয়েছে, যার অধিকাংশেরই সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয়নি। অনেক হত্যাকাণ্ডকে ‘রাষ্ট্রীয় কিলিং’ বলতেও বাধ্য হতে হয়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষ ও সক্রিয় হিসেবে পরিচিত হলেও, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য আজও উদ্ঘাটিত হয়নি। ১৩৭ বারের বেশি প্রতিবেদন দাখিলের সময় পিছিয়ে যাওয়াই প্রমাণ করে-গণমাধ্যমকর্মী হত্যার বিচার চাওয়াটাও যেন ঝুঁকিপূর্ণ। গণমাধ্যমের কর্ণধারখ্যাত ব্যক্তিরা এ সকল বিষয়ে সোচ্চার না হয়ে সময়ের প্রেক্ষাপটে নিজেদেরকে কোন কোন দলের মুখপাত্রে রূপান্তরিত করে নিজেদের ঐক্যের মাঝে বিভাজন সৃষ্টিতে পিছপা হয় না। একে অন্যকে শত্রু বানিয়ে চর দখলের মত কোন কোন মিডিয়া হাউজ দখল নেওয়ার নজিরে অন্যান্য দৃষ্টান্তও নিকট অতীত। এ সকল দৃষ্টান্ত মিডিয়া বান্ধব অনেকের রসের খোরাকও বটে। মিডিয়াকে দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথা তো আছেই।
এরই ধারাবাহিকতায় উগ্র ও উন্মাদ গোষ্ঠীগুলো গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণের মাত্রা বাড়াতে বিন্দুমাত্র সংকোচ বোধ করে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একাধিক গণমাধ্যম কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত। সর্বশেষ ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিকতার দিকপাল নুরুল কবিরের ওপর হামলা এবং দমকল বাহিনীকে বাধাগ্রস্ত করে ভবনে আটকে পড়া সাংবাদিকদের জীবনঝুঁকিতে ফেলার দৃশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের গণমাধ্যমের ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরেছে।
একই সঙ্গে কারাবরণ, চাকরিচ্যুতি ও হয়রানির ঘটনাও বাড়ছে। তবে এখানে স্বীকার করতেই হবে-সব গণমাধ্যমকর্মী নির্দোষ নন। কেউ কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করতে গিয়ে নিজেকে দলীয় কর্মীর চেয়েও বেশি উগ্রভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা অপেশাদারিত্বেরই নামান্তর। অথচ বহু পেশাদার ও মুক্তমনা সাংবাদিক শুধুমাত্র নামমাত্র ট্যাগের কারণে কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসবের প্রতিবাদ করতে গেলেও অনেকে নতুন করে নির্যাতনের শিকার হন-যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য মারাত্মক অন্তরায়।
পরিশেষে বলতে হয়, একদিকে যেমন কিছু গণমাধ্যমকর্মী রাজনৈতিক দালালিতে জড়িয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে কিছু গণমাধ্যম নিজেদের অতি শক্তিশালী ভাবতে গিয়ে অতীতের দমন-পীড়নের ইতিহাস ভুলে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত যেভাবে অপরিপক্ব ও নব্য গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে, তাও স্বাধীন ও পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আজ যাদের মাথার ওপর তুলে নাচানো হচ্ছে, কাল তারাই গণমাধ্যমকে শত্রু ভেবে আক্রমণে লিপ্ত হচ্ছে-নিজেকে জাহির করার প্রতিযোগিতায়।
এই বাস্তবতায় গণমাধ্যম হওয়া উচিত নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, দালালিমুক্ত ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু গণমাধ্যমকে হাতিয়ার বানিয়ে দলীয় চামচা হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। মেরুদণ্ড সোজা রেখে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে পারলেই গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ হিসেবে তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য-অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মিলিয়ে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে। তবু আশা রাখি, পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও সাহসই পারে এই অনিরাপদ বাস্তবতার মধ্যেও গণমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখতে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Related posts